“ মূল দেবতার অর্চ্চনা করিলে তাহার সাঙ্গপাঙ্গ সকলি তৃপ্ত হইয়া থাকে। আড়ম্বরাদি কার্য্যে অখুত্ সম্পাদন হয় না। কেবল বিশুদ্ধ ভক্তি দ্বারাই ভগবানের তৃপ্তি হয়, ঐশ্বর্য্যাদি অহঙ্কারের বাধ্য নয়। মায়াময় সংসারে ঐহিক বৈভবেই মত্ত মাধুর্য্য রসের অভাব থাকায় ভজন সাধনে কৃপা উপলব্দি হয় না, বিশুদ্ধ ভক্তির প্রয়োজন। মাধুর্য্য রস ভিন্ন ভগবান লাভ করিতে পারে না। ভগবৎ প্রেমই পরমপদ, কর্ত্তৃত্বাভিমানে জীব সকল সংসার সাগরে ভাসিয়া বেড়ায়। দিবানিশি নাম করিবে। ভগবানের নাম রূপ সতত চিন্তা করিলে দেহ, মন, বুদ্ধি বিশুদ্ধ হইয়া ভক্তি প্রকট হয়। বিশুদ্ধ ভক্তি লাভ হইলেই প্রেম লাভ হয়, সেই প্রেমেই কৃষ্ণচন্দ্র মিলন ঘটে। উৎসব কি সভার মধ্যে তিনি থাকেন না।”
(বেদবাণী-১ / ১১১)
শ্রীশ্রী রামঠাকুর।
ঠাকুর প্রসঙ্গে 

আমরা
ভাবতেও পারিনা যে ভাত বা রুটি না খেয়ে মানুষ কেমন করে বাঁচতে পারে! অন্তত
দেহরক্ষার জন্য মানুষের মোটামুটি খাদ্যের প্রয়োজন, এই আমরা জানি। কিন্তু
ঠাকুর ছিলেন এ নিয়মের বহির্ভূত। তাঁকে আমরা ভাত, রুটি, লুচি খিচুড়ি,
মিষ্টান্ন প্রভৃতি কখনো খেতে দেখিনি। শুনতাম, এমনি নাকি যুগের পর যুগ চলে
গেছে, তিনি ভাত খাননি। সাধারণতঃ ঠাকুরের খাদ্যের বিবরণ শুনে লোকের তাক্
লেগে যেত।
কোন ভক্তের গৃহে উপস্থিত হলে ঠাকুরের জন্য ভক্ত তাঁর সাধ্যানুসারে নানাবিধ ফল, মিষ্টি, খই, দুধ, সরবৎ,
ভাবের জল ইত্যাদি ব্যবস্থা করতেন। ভক্তের আহ্বানে ঠাকুর আসন গ্রহণ করতেন
এবং কিছুক্ষণ কর গুনে গুনে কি যেন আওড়াতেন। তারপর গ্রহণ করতেন হয়ত একটি
চাঁপাকলা একটু ঘি ও চিনির সঙ্গে। ভক্তের অনুরোধে কখনো দুধ বা ভাবের জলে
চুমুক দিতেন। অবশিষ্ট প্রসাদ উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হত। তখন
ভক্তেরা জানতেন যে ঠাকুরের সেবার জন্য চাঁপাকলা চাই-ই।
জয়রাম 

"শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্রদেব" - শ্রীসুশীলচন্দ্র দত্ত
শ্রীমৎ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
(শ্রীশ্রীকৈবল্যধামের তৃতীয় মোহন্ত)
শ্রীশ্রীরামঠাকুর আবির্ভাব
শতবার্ষিকীস্মারক গ্রন্থ
চলমান অংশ ৬...
জয় গুরু সত্য নারায়ণ।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
ফেণীতে শ্রীশ্রী ঠাকুরের জন্মোত্সব অনুষ্ঠানে অন্যান্য সকল গুরুভ্রাতাদের সহিত রাণীবাড়ী হইতে ঠাকুরের আশ্রিত শ্রীযুক্ত সুরেশ্বর চট্টোপাধ্যায় যোগদান করিয়াছিলেন। সন্ধ্যার পর ফিরিয়া যাওয়ার সময় তিনি যখন কোয়ার্টারের দোতলায় আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিলেন তখন ঠাকুর খাটের নিচে বারে বারে দেখিতে লাগিলেন। আমি সামনে ছিলাম কাজেই জিজ্ঞাসা করিলাম - "ঠাকুর মশায়, কি দেখেন?" ঠাকুর বলিলেন - "দেখেন ত, এইখানে এক জোড়া জুতা ছিল।" ঠাকুরের কাপড়ের জুতা ছাড়া আর জুতা নাই বলিলাম। এই জুতা জোড়াই আমাকে দেন। ঠাকুর বলিলেন। আমি তাহাই করিলাম। সেই জুতা জোড়া হাতে নিয়া সুরেশ্বর বাবুকে বলিলেন - "আপনার জুতা হারাইয়া গিয়াছে, আপনি এই জুতা পায়ে দিয়া যান, এই দারুন শীত, খালি পায়ে যাইতে পারবেন না।" সুরেশ্বর আবেগে কাঁদিয়া ফেলিয়া জুতা জোড়া মাথায় নিয়া বলিলেন - "এই জুতা জোড়া আমি কেমন করিয়া পায়ে দিব? আমি এই চরণ নিত্য পূজা করিব!" ঠাকুর বলিলেন - "এই কেমন ভক্তি, কেমন ভালবাসা! আপনি কি শুধু আমাকে মাথায়ই রাখিয়াছেন, আপনার শরীরের আর কোথাও কি আমি নাই? দিলে সর্ব্বশরীরই দিতে হইবে।" সুরেশ্বর বাবু চোখের জল নিয়াই স্থান ত্যাগ করিলেন কারণ গাড়ীর সময় হইয়া গিয়াছে। আমি বলিলাম - "শুভ্দার জুতাও ত চুরি হইয়াছে।" ঠাকুর বলিলেন - "শুভবাবুর টাকা আছে, সে জুতা নোয়াখালী যাইয়াই কিনিতে পারিবে, আর সে ত মোটর গাড়িতে যাইবে, তা কস্ট হইবে না।"
ঠাকুরের উপর যারা নির্ভরশীল তাদের জন্য তাঁর কত দরদ ঠাকুরের এই আচরণ হইতে বুঝিতে পারা যায়।
- শ্রীঅখিল চন্দ্র রায়
জয় রাম..জয় গোপাল
শ্রী শ্রী ঠাকুরের শ্রী চরণের আশ্রয়ে সবার জীবন মঙ্গলময় হোক..সবাই ভালো থাকুন..সুস্থ থাকুন।
একবার নিভৃতে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আচ্ছা ঠাকুর এই মায়াময় সংসারে আমাদের যাতে পুনঃ প্রবেশ করতে না হয় এবং আমরা যাতে একেবারেই মুক্তি লাভ করতে পারি তার পথ কি?
ঠাকুর বলিলেন, -----'সমস্ত কামনা বাসনা ত্যাগ করিয়া আকাঙ্খা অহংকার মমতা ও কাম ক্রোধ শূন্য হইয়া একমাত্র চিত্তে ধৈর্য্য ধরিয়া 'নাম' করিলে মুক্তি লাভ করা যায়।'
জয় রাম 

"কৃপাসিন্ধু রামঠাকুর "-----মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায়
কর্ম বড় নাকি ধর্ম?
এটা বোঝার পূর্বে কর্মের সংজ্ঞা জানাটা খুব জরুরি। শ্রীবিষ্ণুপুরাণে বর্ণিত রয়েছে-
“কর্ম তাকেই বলা হয়, যা বন্ধনের কারণ না হয় এবং বিদ্যাও তাকেই বলা যায় যা মুক্তির সাধন হয়। এসব ছাড়া অন্য কর্ম তো পরিশ্রমরূপ এবং অন্য বিদ্যা কলাকৌশলমাত্র।”
আমরা জানি যেসমস্ত কর্ম কৃষ্ণকেন্দ্রিক নয় তা বন্ধনের কারণ আর যে কর্ম কৃষ্ণের প্রীতি বিধানে যুক্ত তা মুক্তিদায়ক। যেমন ভগবদগীতায় ভগবান বলেন-
“বিষ্ণুর প্রীতি সম্পাদন করার জন্য কর্ম করা উচিত; তা না হলে কর্মই এই জড় জগতে বন্ধনের কারণ। তাই, হে কৌন্তেয়! ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্যই কেবল তুমি তোমার কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠান কর এবং এভাবেই তুমি সর্বদাই বন্ধন থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।”
– (ভ:গী: ৩/৯)
বিষ্ণুপুরাণোক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের বাণী ও ভগবদগীতার বাণী থেকে সহজেই বুঝতে পারা যায় যদি কর্মের উদ্দেশ্য বা কেন্দ্র কৃষ্ণ না হন তবে তা মুক্তিদায়ক হয়না, ফলস্বরূপ সেই কর্ম কেবলই কলাকৌশল মাত্র অথবা কেবলই পরিশ্রম। তাই আমাদের কৃষ্ণের সন্তুষ্টির জন্য কর্ম সম্পাদন করা কর্তব্য।
কর্মের এই অতি সুন্দর ব্যবস্থাপনাকে বলা হয় কৃষ্ণভাবনা। এভাবেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে জীবন পরিচালনা করা উচিত।
“পৃথিবীতে ধর্ম নামে যাহা কিছু চলে
ভাগবত কহে তাহা পরিপূর্ণ ছলে”
অতএব, প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে কৃষ্ণের সন্তুষ্টি বিধানে কৃত কর্ম এবং কর্মের সংজ্ঞা এবং উদ্দেশ্যও হচ্ছে সেটি।
ধর্ম বড় নাকি কর্ম বড় বিষয়টি এমন নয়। আসলে কর্মের উদ্দেশ্যে এবং কর্ম কর্তার মনোবৃত্তির উপর নির্ভর করে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। মোটকথা হচ্ছে কর্মকে যদি ধর্মে রূপান্তরিত করা যায় তবে তা মহান অন্যথায় সেইসব কর্ম গাধার খাটুনি ছাড়া কিছুই না।। ধন্যবাদ।।
একবার ঠাকুরকে বলিলাম "আপনাকে এত ভালো লাগে, আপনি দেহ রক্ষা করিলে আমাদের কি উপায় হইবে?" "দেহান্ত হইলে আরও বেশি পাইবেন" ----এই অমোঘ সত্য এখন প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করিতেছি।
জয় রাম 

" শ্রীশ্রীরামচন্দ্র স্মৃতি কথা " ----রাঁজেন্দ্র লাল বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রশ্ন:- গৃহস্থ্য ও গৃহমেধী কাদেরকে বলা হয়েছে? কোনটি শ্রেয়? কেন?_*
*উত্তর:-* শাস্ত্রে গৃহীদের গৃহস্থ এবং গৃহমেধী এই দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। গৃহস্থ হচ্ছেন তাঁরা, যাঁরা স্ত্রী-পুত্র সহ গৃহে অবস্থান করলেও আত্মতত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য পারমার্থিক চিন্তায় মগ্ন হয়ে জীবন যাপন করেন। আর গৃহমেধী হচ্ছে তারা, যারা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের স্বার্থসিদ্ধির কাজেই কেবল মগ্ন থেকে মাৎসর্যপূর্ণ জীবন যাপন করে। মেধী শব্দটির অর্থ হচ্ছে অপরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। গৃহমেধীরা কেবল তাদের পরিবারের স্বার্থে মগ্ন থাকায় অবশ্যই অন্যদের প্রতি মাৎসর্যপরায়ণ। তাই গৃহমেধীরা পরস্পরের প্রতি সদাশয়পূর্ণ নন, এবং বৃহত্তর ও সামগ্রিক বিবেচনায় এক সম্প্রদায় আর এক সম্প্রদায়ের প্রতি, এক সমাজ আর এক সমাজের প্রতি অথবা এক দেশ আর এক দেশের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে সম্পর্কিত নয়। কলিযুগে গৃহীরা পরস্পরের প্রতি মাৎসর্যপরায়ণ, কেননা তারা পরম তত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধ বা উদাসীন। তাদের শ্রবণীয় রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বহু বিষয় রয়েছে, কিন্তু যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানের অভাবে তারা জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি আদি জীবনের চরম দুঃখ সম্বন্ধীয় সমস্ত প্রশ্নগুলি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। প্রকৃতপক্ষে, জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধিজনিত সমস্ত সমস্যার আত্যন্তিক সমাধান করাই মানব জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। কিন্তু গৃহমেধীরা, জড়া প্রকৃতির প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে আত্মতত্ত্বজ্ঞান লাভের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। জীবনের সমস্ত সমস্যার চরম সমাধান হয় ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে, যে কথা শ্রীমদ্ভগবদগীতায় (৮/১৬) বলা হয়েছে-জড় জগতের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা-জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধি সর্বতোভাবে উপশম হয়।
ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার উপায় হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের নাম, রূপ, গুণ, লীলা, পরিকর এবং বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে শ্রবণ করা। মূর্খ মানুষেরা তা জানে না। তারা কেবল অনিত্য বস্তুসমূহের নাম, রূপ ইত্যাদি সম্বন্ধে শুনতে চায়, এবং তাদের আত্যন্তিক কল্যাণ সাধনের জন্য তাদের শ্রবণের প্রবণতাকে কিভাবে নিযুক্ত করতে হয়, তা তারা জানে না। বিপথগামী মানুষেরা পরম তত্ত্বের নাম, রূপ, গুণ আদির সম্বন্ধে অসৎ সাহিত্য রচনা করে। তাই অন্যের প্রতি মাৎসর্যপরায়ণ হয়ে গৃহমেধীর জীবন-যাপন করা উচিত নয়; শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে আদর্শ গৃহস্থের জীবন-যাপন করাই মানুষের কর্তব্য।